লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের শেষ রক্ষক: প্রবীণ পটুয়া লাল্টু চিত্রকর

Prathamalorbarta
By -
0

বাংলার পটচিত্র পট বা বস্ত্রের উপর আঁকা এক প্রাচীন লোকচিত্রকলা, যা প্রাচীন বাংলার অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। প্রাচীনকালে যখন কোনো রীতিসিদ্ধ দরবারি শিল্পকলার অস্তিত্ব ছিল না, তখন এই পটশিল্পই বাংলার শিল্প ঐতিহ্যের প্রধান বাহক হয়ে উঠেছিল। দেবদেবীর কাহিনী, লোককথা কিংবা সমাজের নানা ঘটনা উজ্জ্বল প্রাকৃতিক রঙে ফুটিয়ে তুলে পটুয়ারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে পট দেখাতেন। এই গানের সঙ্গে পটের চিত্রকলা মিলে এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক মিশ্রণ তৈরি করত, যা শুধু বিনোদনই নয়, নৈতিক শিক্ষা ও সমাজচেতনাও জাগরুক করত।যারা এই পটচিত্র অঙ্কন করেন, তাঁদের বলা হয় পটুয়া। বীরভূম জেলার ইটাগরিয়া গ্রামের প্রবীণ পটুয়া লাল্টু চিত্রকর এই লুপ্তপ্রায় শিল্পকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন একক প্রয়াসে।


মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে এই পেশায় প্রবেশ করেছিলেন তিনি। এখন তাঁর বয়স ৬৪ ছুঁইছুঁই, পট আঁকা ও পটের গান গাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো ৪৮ বছরেরও বেশি সময়। তাঁর তুলির টানে ফুটে ওঠে সরল কিন্তু শক্তিশালী রেখা, পৌরাণিক চরিত্রগুলো যেন শুধু দৈবী আলোয় নয়, মানবীয় উষ্ণতায়ও উদ্ভাসিত হয়।কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এখানেই থেমে যাচ্ছে। পটুয়া পেশায় আর্থিক অনটনের কারণে লাল্টুবাবুর ছেলেরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। তাঁর পরে এই শিল্পকে যে আর কেউ ধরে রাখবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আধুনিকতার ঝড়ে গ্রামে গ্রামে পট দেখানোর দিন প্রায় শেষ, বাণিজ্যিক চাহিদাও কম। তবু লাল্টু চিত্রকর অবিচল। তাঁর গানে ও তুলিতে বেঁচে আছে বাংলার এক অমূল্য ঐতিহ্য, যা হয়তো শীঘ্রই শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে—এমন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতি রক্ষা করতে হলে শুধু প্রশংসা নয়, বাস্তব সমর্থনও দরকার। লাল্টু পটুয়ার মতো শিল্পীরা না থাকলে বাংলার এই অনন্য লোকঐতিহ্য চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)